মৌলবী বরকতুল্লাহ্
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে, মৌলবী বরকতুল্লাহ্র নাম তারা অবশ্যই শুনেছেন। ১৯১৫ সালের ১লা ডিসেম্বর তারিখে কাবুলে স্বাধীন ভারতের যে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়, রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ ছিলেন তার রাষ্ট্রপতি, আর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মৌলবী বরকতুল্লাহ্।
মৌলবী বরকতুল্লাহ্র বিপ্লবী জীবনের সবটাই কেটেছে ভারতের বাইরে, প্রবাসে এশিয়া, আমেরিকা, ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাঁর ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের চক্ষুশূল, তাই স্বদেশে ফিরে যাবার পথ কোনো দিন তাঁর জন্য উন্মুক্ত হয়নি। অবশেষে একদিন দেশ থেকে বহুদূরে বিদেশের মাটিতে তাঁকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছিল।
তাঁর জন্মস্থান ছিল ভূপোলে। ১৯০১ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য লণ্ডনে গিয়ে শ্যামলী কৃষবর্মা ও রানার সংস্পর্শে আসেন এবং স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হন। তিনি ১৯০৬-১৯০৮ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় তারকনাথ দাশ প্রমুখ ভারতীয় বিপ্লবী, মার্কিনী ভারত-বন্ধু, আইরন ফেল্পস, আইরিশ-আমেরিকান জাতীয়তাবাদীদের পত্রিকা গ্যালিফ আমেরিকান-এর সহ-সম্পাদক জর্জ ফ্রীম্যান প্রমুখের কর্মতৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৯০৯ সালে তিনি আমেরিকা থেকে জাপানে যান এবং সেখানে তিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দুস্থানী ভাষায় অধ্যাপক হিসাবে কাজ করতে থাকেন। এই সময় তিনি ‘ইসলামিক ফ্র্যাটারনিটি’ নামে এক পত্রিকাও প্রকাশ করে চলেছিলেন। তাঁর এই সমস্ত কার্যকলাপের উপর ব্রিটিশ সরকারের বিশদ দৃষ্টি পড়েছিল। কিছুদিন বাদে তাদের চাপে জাপান সরকার এই পত্রিকাটির প্রকাশ নিষিদ্ধ করে দিলেন। তা ছাড়া তাঁকে অধ্যাপকের পদ থেকে অপসারিত করা হলো। অতঃপর ১৯১৪ সালের ২২ শে মে তিনি আবার ফিরে এলেন আমেরিকায় এবং সেখানে ‘গদর’ পার্টির অন্যতম নেতা হিসাবে কাজ করে চললেন।
এই ১৯১৪ সালেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণ-দামামা বেজে উঠেছিল। এই বিশ্বযুদ্ধের সূচনা থেকেই ভারতীয় এবং বিশেষ করে প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের কর্মতৎপরতা যথেষ্ট পরিমাণে বেড়ে চলেছিল। এই যুদ্ধের চাপে ব্রিটিশ সরকার বিশেষভাবে বিব্রত হয়ে পড়বে, অতএব ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সৃষ্টি করার পক্ষে এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ, এই সুযোগকে কাজে লাগাবার জন্য বিপ্লবীরা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বিদ্রোহকে সফল করে তুলতে হলে অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে অস্ত্রশস্ত্র ও আর্থিক সাহায্য লাভের জন্য ইংল্যাণ্ডের প্রতিপক্ষ জার্মান সরকার ও তাদের মধ্যে পরামর্শ ও আলাপ আলোচনা চলছিল। এই আলাপ আলোচনার ফলে তাদের মধ্যে এই চুক্তি সম্পন্ন হলো যে, জার্মান সরকার ভারতীয় বিপ্লবীদের অস্ত্রশস্ত্র ও আর্থিক সাহায্য জুগিয়ে চলবে। এই সন্ধি-চুক্তিকে কার্যকর ও সুপরিচালিত করার উদ্দেশ্যে যে কমিটি গঠিত হয়েছিল তা ‘বার্লিন কমিটি’ নামে সুপরিচিত। মৌলবী বরকতুল্লাহ্ এই কমিটির অন্যতম সভ্য ছিলেন।
ভারতের ভিতরে এবং বাইরে এটা অনেকেই আশা করছিল যে একটি অভ্যুত্থান সৃষ্টির ব্যাপারে ভারতীয় বিপ্লবীরা আফগানিস্তান সরকারের কাছ থেকে অবশ্যই সাহায্য পাবে। এই উদ্দেশ্যে আফগানিস্তান সরকারের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করার জন্য ১৯১৫ সালে বার্লিন কমিটির পক্ষ থেকে কাবুলে একটি ইন্দো-জার্মান মিশন পাঠানো হয়। ভারত, জার্মান ও তুরস্ক এই তিন দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই যুক্ত মিশনটি গঠিত হয়েছিল। ভারতীয়দের মধ্যে ছিলেন রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ ও মৌলবী বরকতুল্লাহ্।
কিন্তু আর্থিক অভাব-অনটনের ফলে এই মিশনটিকে খুবই অসুবিধার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছিল। এই মিশন ব্যর্থ হয়ে বার্লিনে ফিরে যাবার পর রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ জার্মান সম্রাট কাইজারের কাছে যে রিপোর্ট পেশ করেছিলেন, তাতে তিনি এই অসুবিধার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন। মৌলবী বরকতুল্লাহ্ও সেদিন তাঁর এই অভিযোগ সমর্থন করেছিলেন।
কাবুলে এসে সেখানকার পরিস্থিতি দেখে মিশনের মোহভঙ্গ হয়ে গেল। আফগানিস্তানের আমির হাবিবউল্লাহ্ ইতিপূর্বে তাদের সাহায্য দেবেন বলে কিছুটা ভরসা দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তখন তিনি তা থেকে বহুদূর সরে গিয়েছেন। তিনি ইংরেজদের খুশী রাখার জন্য এই পরিকল্পিত বিদ্রোহের কথা ভারত সরকারের কাছে ফাঁস
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments